উন্নতমানের চাল ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাতেই হয়ে গেল নিম্নমানের

সিলেট বিডি নিউজ নেট
প্রকাশিত ১৭, জুলাই, ২০২১, শনিবার
উন্নতমানের চাল ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাতেই হয়ে গেল নিম্নমানের

রোকন সরকার, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে ঈদ উপলক্ষে দুস্থদের ভিজিএফের ১৫০ বস্তা চাল নিয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। চলছে ব্যবসায়ী ও খাদ্য বিভাগের রশি টানাটানি। এই নিম্নমানের চালগুলোর দায়িত্ব কেউ না নেয়ায় ফেরত দেয়া হয়েছে।

সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে উন্নত মানের চাল বের হয়ে তা হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানোর পূর্বেই নিম্নমানের খাওয়ার অযোগ্য পচা চালে রূপান্তরিত হলো কি ভাবে এ রহস্যের জট খুলছে না।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার দুপুরে উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদে। হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আলাউদ্দিন বসুনিয়া জানান, ঈদ উপলক্ষে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৮০৩ মেট্রিক টন ৫৬০ কেজি চাল ভিজিএফের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী হাতিয়া ইউনিয়নে বিতরণের জন্য ৬৩ মেট্রিক টন ২১০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়। শুক্রবার দুপুরে সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে হাতিয়া ইউনিয়নের জন্য ভিজিএফের বরাদ্দকৃত প্লাস্টিক বস্তায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি সিল মোহরযুক্ত ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তা প্রতি গাড়িতে ১৫০ বস্তা করে ৬টি গাড়িতে ৯০০ বস্তা চাল পাঠানো হয়।

হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন জানান, সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে ভিজিএফ এর বরাদ্দকৃত চাল ৬টি গাড়িতে ৯০০ বস্তা ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসা হয়। পরিষদের গুদামে চালের বস্তা গুলো নামানোর সময় ৫টি গাড়ির চাল উন্নত মানের হলেও ১টি গাড়ির ১৫০ বস্তা চাল প্লাস্টিকের পুরনো বস্তা ও সরকারি সিল না থাকায় সন্দেহ হয়। ওই গাড়ির বস্তাগুলোর চাল খুবই নিম্নমানের খাওয়ার অযোগ্য পচা লাল রঙের চাল হওয়ায় তা সরকারি খাদ্য গুদামে ফেরত পাঠাই।

তিনি আরও বলেন, গাড়িগুলোতে মাত্র দুইজন গ্রাম পুলিশ ছিল। খারাপ চালের বিষয়টি আমি ইউএনও ও খাদ্যগুদাম কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তারা চালের বস্তা গুলো খাদ্য গুদামে ফেরত পাঠাতে বলেছেন। তাই নিম্নমানের চালের বস্তাগুলো ফেরত পাঠিয়েছি।

নিম্নমানের চাল বহনকারী গাড়ির চালক নাহিদ ইসলাম বলেন, উলিপুর সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে ১৫০ বস্তা চাল হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসি। এরপর চালগুলো খাবার অযোগ্য হওয়ায় চেয়ারম্যান সাহেব তা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং আমাকে চালের বস্তাগুলো ফেরত নিয়ে যেতে বলেন। তাই ফেরত আনি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ১৫০ বস্তা নিম্নমানের চালের দায় দায়িত্ব কেউ নিতে রাজি নন। খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা বলছেন এ চাল আমি গুদাম থেকে সরবরাহ করিনি অপরদিকে গাড়ির চালক বলছেন চালের বস্তা সরকারি গুদাম থেকে আনা হয়েছে।

অপর দিকে উপজেলা খাদ্য ব্যবসায়ী ও মিল চাতাল মালিক সমিতির আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান বুলেট ঝামেলামুক্ত ভাবে চালের টলি ছাড়িয়ে নিতে এবং বিষয়টি ধামাপাচা দিতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খাদ্য ব্যবসায়ী জানান, উলিপুর সরকারি খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা ও ধান চাল ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে এ ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত। খাদ্য গুদামের কর্মকর্তার যোগসাজশে গুদাম থেকে উন্নত মানের চাল ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে পাঠানোর সময় পথিমধ্যে ওই সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে ভালো চাল পরিবর্তন করে নিম্নমানের খাবার অযোগ্য চাল সরবরাহ করেন। যেখানে গুদামের ভাল চালের বর্তমান বাজার মূল্য ৪৪-৪৫ টাকা কেজি, সেখানে নিম্নমানের চালের মূল্য ২০/২৫ টাকা।

ওই সূত্রটি আরও নিশ্চিত করেছেন, হাতিয়া ইউপি থেকে ফেরত ১৫০ বস্তা চাল সরকারি গুদামে না এনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তাদের গুদামে নামিয়ে নিয়েছে।

খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নিম্নমানের চালের দায়িত্ব না নেয়ার ফলে ১৫০ বস্তা চাল নিয়ে উপজেলা খাদ্য বিভাগ ও ব্যবসায়ীদের রশি টানাটানি চলছে।

ওই সূত্র নিশ্চিত করেন, খাদ্য ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বুলেট এ নিম্নমানের চালের মালিক। তিনি কৌশলে চালগুলো হাতিয়া ইউপিতে সরবরাহ করেছেন।

এ বিষয়ে খাদ্য ব্যবসায়ী ও মিল চাতাল মালিক সমিতির আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান বুলেট নিম্নমানের চালের মালিকানার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বার বার অনুরোধ করেন।

নিম্নমানের চালের গাড়িটির ব্যাপারে প্রশাসনের হাত থেকে রক্ষা পেতে কেন তদবির করেছিলেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাদ্য ব্যবসায়ীদের নেতা হিসাবে আমাকে এটি করতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে করেছি।

উলিপুর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) শাহীনুর রহমান বলেন, খাদ্য গুদাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। গুদাম থেকে ভাল চাল পাঠানো হয়েছে। নিম্নমানের চাল সেখানে কীভাবে পৌঁছাল তা আমার জানা নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

১৫০ বস্তা নিম্নমানের চাল ভিন্ন বস্তায় কি করে সেখানে পৌঁছাল এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাল গুদাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি আমার দেখার দায়িত্ব না।

ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ফেরত পাঠানো নিম্নমানের চাল পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলাউদ্দিন বসুনিয়া জানান, এ বিষয়ে কেউ আমাকে কিছু জানায়নি। ওসি এলএসডি (ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা) বিষয়টি সঠিকভাবে বলতে পারবেন। আমি এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, হাতিয়া ইউনিয়নে খাদ্য গুদাম থেকে নিম্নমানের চাল সরবরাহের বিষয়ে চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছেন। আমি ওই চাল ফেরত পাঠাতে বলেছি। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আমি কথা বলেছি। কোনোভাবেই নিম্নমানের চালের বিষয়টি মেনে নেয়া হবে না। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, ঘটনা জানার পর ওই ইউনিয়ন পরিষদে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি এবং ভিজিএফের ভালো চাল দুস্থদের মাঝে বিতরণের তদারকি করেছি।

কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আবু বকর বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। খাদ্য গুদামে এরকম হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 172 total views

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
error: Content is protected !!